ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আত্মশক্তিতে বলিয়ান হতে শেখায়: টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন টেকসই স্থানীয় সংগঠন: স্থানীয় সংগঠন উন্নয়নে মাতৃভাষার প্রয়োগ অপরিহার্য

0
বিশ্ব মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলন, ২১ ফেব্রুয়ারি শক্তিশালী-আবেগপ্রবণ এক অসাধারণ অনুষঙ্গ। একুশ তাই আমাদের কাছে শুধু ভাষার কথাই বলে না, একুশ বরং একটা চেতনার নাম, লক্ষ্য পূরণের প্রশ্নাতীত অঙ্গিকারের নাম এই একুশ। একুশ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা দিবস বা শহীদ দিবস থেকে এখন পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ঘোষিত এই দিবস সারা পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার প্রতি এক যথাযথ সম্মান। এই দিবসটি বিশ্ববাসীর কাছে মাতৃভাষার গুরুত্বটি তুলে ধরে।
মাতৃভাষা এবং উন্নয়ন: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম। ভাষা ছাড়া আসলে উন্নয়ন অসম্ভব। ভাষাই যোগোযোগের প্রাথমিক উপায়, ভাষার মাধ্যমেই কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য কার্যকর যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যোগাযোগ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত, যা ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। আর একারণেই টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত- ভাষা। উন্নয়ন ও ঐক্যের জন্যও ভাষা অপরিহার্য। পৃথিবীর সব দেশের সব উন্নয়নেই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বিশেষ করে মাতৃভাষা উন্নয়নে যে কার্যকর ভূমিকা রাখে তার হাজারো উদাহরণ আছে বিশ্বজুড়ে। আফ্রিকার দেশ মালির একটি উদাহরণ উন্নয়ন গবেষকদের কাছে বেশ প্রসিদ্ধ। দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা এক সময় পরিচালিত হতো ফরাসী ভাষায়, কারণ এটি এক সময় ফ্রান্সের কলোনী ছিলো। সরকার চিহ্নিত করলো যে, ভিনদেশী ভাষায় পড়াশুনা হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরেপড়ার হার বেশি। সরকার পরীক্ষামূলকভাবে একটি এলাকায় মালির নিজস্ব ভাষাকে শিক্ষার প্রথম ভাষা হিসেবে প্রচলন করে। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অন্য ভাষাও শেখানো হয়। এতে করে অভূতপূর্ব ফলাফল পাওয়া যায়। ‘কনভারজেন্ট পেডাগজি’ নামে পরিচিত সেই শিক্ষা পদ্ধতি ছয় বছর ধরে পরীক্ষা করা হয়। পরে দেখা যায় মাতৃভাষায় পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র ফরাসি ভাষার স্কুলগুলির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। এটি একটি ছোট উদাহরণ কেবল। এই ধরণের উদাহরণ পওয়া যাবে আরও অনেক।
মাতৃভাষা এবং স্থানীয় সংগঠন: বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানসংগঠন। বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতেই এসব স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সেগুলোর স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় এনজিও, সিএসও এবং সংগঠন বিদেশি কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এক্ষেত্রে ভাষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তাঁদের সামনে এস দাঁড়ায়। কারণ বিদেশি প্রতিষ্ঠান, এমনকি যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কাজ করে, তাদের যোগাযোগ মাধ্যম ভিনদেশি ভাষা, মূলত ইংরেজি। অথচ স্থানীয়করণের অন্যতম শর্ত স্থানীয় ভাষার ব্যবহার।
ভাষার দূরত্ব স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে পার্থক্যের দেওয়াল তৈরি করে দেয়। কোনও প্রকল্প বা অনুদানের জন্য দরখাস্ত আহবান করা হলে তার সমস্ত দলিলপত্র থাকে ইংরেজিতে। ফলে দেখা যায়, প্রথমেই স্থানীয় সংস্থাগুলো প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে। যদিও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে তুলনামূলকভাবে কম খরচে অধিকতর কার্যকারভাবে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় সম্প্রদায় এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর কার্যকর
অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে সেই প্রক্রিয়াটিতে অবশ্যই স্থানীয় ভাষায় পরিচালিত হতে হবে। স্থানীয় মানুষ ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে যোগাযোগ করতে হবে ‘আমাদের ভাষায়’, কারণ ‘তাদের ভাষায়’ যোগাযোগে বাধ্য করা হলে সেটা প্রথমেই স্থানীয়দের ক্ষমতায়নে চরম আঘাত হানে।
উপসংহার: ভাষা দিবসের এই দিনে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের দাবি তোলা হতে পারে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকান্ডে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার বিষয়ে যেহেতু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রæতিও আছে, তাই স্থানীয় সংগঠনগুলোর, স্থানীয় সুশীল সমাজেরও মাতৃভাষার প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ সর্বত্র জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। এটিই আমাদের একুশের চেতনা।

Download from here

Social Sharing

Leave A Reply